
৪৩ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি, অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিনকে রাজকীয় বিদায়
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
দীর্ঘ ৪৩ বছরের কর্মজীবন শেষে অবসরে গেলেন সমতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন। প্রিয় শিক্ষকের বিদায়ের খবরে শনিবার (২৫ এপ্রিল) ছাতক উপজেলার সমতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, সহকর্মী, এলাকাবাসী এবং আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ছুটে আসেন প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো সম্মান জানাতে।
বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে সকাল থেকেই ভিড় জমে শুভাকাঙ্ক্ষীদের। মোটরসাইকেল বহরের মাধ্যমে অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিনকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হলে শিক্ষার্থীরা ফুলেল শুভেচ্ছা ও করতালিতে তাঁকে বরণ করে নেন।
অবসর গ্রহণ উপলক্ষে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজন করা হয় জাঁকজমকপূর্ণ বিদায় সংবর্ধনা। অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মাননা স্মারক, উপহার সামগ্রী, ফুলেল শুভেচ্ছা, নগদ অর্থ, ক্রেস্ট ও পাঞ্জাবি প্রদান করা হয়। বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সর্বমোট প্রায় ১৫ লাখ টাকা সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়া ১৯৯৫ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে একটি ওমরাহ প্যাকেজ উপহার দেন।
অনুষ্ঠান শেষে ফুলে সাজানো একটি প্রাইভেটকারে করে সাবেক শিক্ষার্থীরা তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেন। বিদায়ের এই মুহূর্তে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ উপস্থিত সবাই।
জানা যায়, ১৯৮৩ সালের ১ অক্টোবর সমতা স্কুল অ্যান্ড কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন নাসির উদ্দিন। পরে ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ধীরে ধীরে সহকারী শিক্ষক, সিনিয়র শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং পরে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৭ সালে তৎকালীন অধ্যক্ষ মরহুম আব্দুস সামাদের আকস্মিক মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের সফল সমাপ্তি ঘটে ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল তাঁর অবসরের মাধ্যমে।
বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন বলেন, “বিদায় সত্যিই অনেক কষ্টের। তবে শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর এমন ভালোবাসা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। প্রতিষ্ঠানের যেকোনো প্রয়োজনে আমি সবসময় পাশে থাকবো।”
প্রভাষক মোশাররফ হোসেন বলেন, “স্যারের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, আমাদের অভিভাবক ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে আমরা সততা, সাহস ও দায়িত্ববোধ শিখেছি।”
এসএসসি ১৯৯৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. আব্দুল আহাদ বলেন, “এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে স্যারের অবদান রয়েছে। তাঁর স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবে।”
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এএসএম আব্দুল মুমিনের সভাপতিত্বে এবং প্রভাষক গৌছুল হক নাঈমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন হাজী ইলিয়াস মিয়া, গৌছ খাঁ, দবিরুল ইসলাম, আবু হেনা, পারভেজ মিয়া, নুরুল হক, আওলাদ মিয়া, আশিকুর রহমান, এবিএম মাছুম, ফয়জুল বারী, কামাল উদ্দিন, আতাউর রহমান, সিতাব আলী, সালাহ উদ্দিনসহ অনেকে।
ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন লন্ডন প্রবাসী সমাজসেবক মনছব আলী জেপি ও হীরা মিয়া। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।